আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৫ হাজার ২০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের মূল্য শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২১৯ দশমিক ৯৭ ডলারে, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন ফিউচার বাজারে স্বর্ণের দর ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ২১৬ দশমিক ৮০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ডলারের চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।
বাজার বিশ্লেষক কেলভিন ওং জানান, ডলার দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা স্বর্ণের বাজারকে আরও চাঙ্গা করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বর্ণের দাম স্বল্পমেয়াদে আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ২৪০ ডলার ছুঁতে পারে।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। স্পট সিলভারের দাম বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছেছে। প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও বেড়েছে যথাক্রমে ২ হাজার ৬৭৯ দশমিক ১৫ এবং ১ হাজার ৯৫১ দশমিক ৯৩ ডলারে।
ডয়চে ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডলারের বিকল্প হিসেবে বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ায় ২০২৬ সালের মধ্যে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৬ হাজার ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রভাব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় স্বর্ণ বিনিয়োগকারীদের কাছে অলঙ্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদে ঝোঁক বাড়ায় সোমবার বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩০ ডলার ৪৯ সেন্টে। একই সঙ্গে মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারসও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ৪ হাজার ৭৪০ ডলার ৪০ সেন্টে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) ও প্রডিউসার প্রাইস ইনডেক্স (পিপিআই) প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সম্ভাব্য মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং সুদহার নীতিতে অনিশ্চয়তা স্বর্ণবাজারে প্রভাব ফেলছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্বর্ণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রূপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামেও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে।
দেশীয় বাজারে স্বর্ণমূল্যে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়েছে, সর্বশেষ সমন্বয়ের পর আজ থেকে কার্যকর হয়েছে সংশোধিত দর। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) কর্তৃক বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতি ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা বৃদ্ধি করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একই দিন সন্ধ্যা ৭টা হতে কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি (বিশুদ্ধ) স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ সমন্বয় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। নতুন নির্ধারিত দর অনুযায়ী, প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকায়। ২১ ক্যারেটের ভরি ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ভরি ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। উল্লেখ্য, একই দিনে সকালে স্বর্ণের দাম হ্রাস করা হয়েছিল, যেখানে ২২ ক্যারেটের ভরি নির্ধারিত ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ৩৩৭ টাকা। পরবর্তী সময়ে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয়ের মাধ্যমে বর্তমান দর কার্যকর করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম মোট ৬০ বার সমন্বয় করা হয়েছে—এর মধ্যে ৩৩ বার বৃদ্ধি এবং ২৭ বার হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে, রুপার দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি এবং পূর্ব নির্ধারিত দরই বহাল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব ও স্থানীয় মূল্যমানের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ ধরনের সমন্বয় অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশীয় বাজারে মূল্য পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে স্বর্ণ ও রুপার দামে হ্রাস এনেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের দামে উল্লেখযোগ্য কমতি এনে ২২ ক্যারেটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকা, যা পূর্বের তুলনায় ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কম। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা একইদিন সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, ২১ ক্যারেট স্বর্ণ প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে রুপার বাজারেও মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। ২২ ক্যারেট রুপার দাম প্রতি ভরি ৩৫০ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৭১৫ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৪২৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৩ হাজার ৪৯৯ টাকায় বিক্রি হবে। সংগঠনটির তথ্যমতে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ৫৬ দফা এবং রুপার দাম ৩৫ দফা সমন্বয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতির আলোকে এই ধরনের মূল্য পুনর্নির্ধারণ অব্যাহত থাকতে পারে।