দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট আরও প্রকট। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে করে পাঠদানের মান যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যালয়েই শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি বিদ্যালয়ে তিন থেকে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো স্কুলে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান করতে হয়, যা কোনোভাবেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। একজন শিক্ষক যখন একই সময় একাধিক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, তখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো শ্রেণির উপর পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়। এইভাবে ধাপে ধাপে শিখনের ঘাটতি তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনেও।
শুধু পাঠদানের ক্ষেত্রেই নয়, একজন শিক্ষককে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, মিডডে মিল, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হিসাব রাখা, নানা রিপোর্ট প্রস্তুত করাসহ আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক যতই আন্তরিক হোন না কেন, সীমিত জনবল ও অপ্রতুল সময়ের কারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরাও এই সংকটের কারণে দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে। একজন শিক্ষক একসঙ্গে দুই-তিনটি শ্রেণির ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি সৃষ্টি হয় এবং তারা ধীরে ধীরে স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে।
সরকার শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংকট কাটছে না। অনেক সময় নিয়োগপ্রাপ্তরাও দুর্গম এলাকায় যোগদান করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, ফলে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতেই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা দরকার। বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, স্থায়ী পদ সৃষ্টি, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রণোদনা প্রদান এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যাতে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণ করতে পারে।
প্রাথমিক স্তরেই যদি শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা না পায়, তবে তা পুরো শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখনই সময় কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যেন একজন শিক্ষককে আর একা একাধিক শ্রেণির ভার বইতে না হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারে।
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ‘সাইলেন্ট এক্সপেল’ বা ‘নীরব বহিষ্কার’ বিধান কার্যকর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বন বা আচরণগত অনিয়মের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে বহিষ্কার না করে পরবর্তীতে তার উত্তরপত্র বাতিলের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে। নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে, দায়িত্বরত পরিদর্শক পরীক্ষার শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র পৃথকভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ‘রিপোর্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে জমা দেবেন। এ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকের লিখিত প্রতিবেদনে বহিষ্কারের কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া, নীরব বহিষ্কৃত পরীক্ষার্থীদের পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার ফলাফল আইনগতভাবে অকার্যকর গণ্য হবে। পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এ বিধান কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দুই পদে নতুন নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নতুন উপাচার্য হিসেবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পাচ্ছেন ঢাবির সহ–উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ। সোমবার (১৬ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ তথ্য জানান। অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ছিলেন। এর আগে ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে আবেদন করেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও সম্প্রতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান রাষ্ট্রপতির কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন এবং নিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উচ্চশিক্ষা খাতের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে পুনর্বিন্যাস শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির নেতৃত্বে এই নতুন পরিবর্তন আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংশোধিত ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জি প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বুধবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবার ছাড়া বছরে মোট ৬৭ দিন ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন সূচি অনুযায়ী পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতর ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত টানা ৩৬ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এছাড়া ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশে ২৪ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ১০ দিন এবং শীতকালীন অবকাশ ও বড়দিন উপলক্ষে ২০ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দিন ছুটি নির্ধারিত হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে অর্ধবার্ষিক, প্রাক-নির্বাচনী, নির্বাচনী ও বার্ষিক পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণের পাশাপাশি পরীক্ষার সময়সীমা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও তারিখ পরিবর্তনে পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মকর্তার পরিদর্শন উপলক্ষে পাঠদান স্থগিত বা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে।