ভৌগোলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান: সুযোগ, কূটনীতি ও করণীয়

রনি দাস

প্রাক্তন কূটনীতিক,লেখক ও গবেষক

জুন ২৯, ২০২৫

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট দেশ হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। চারদিকে ভারত দিয়ে ঘেরা এবং দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগর থাকায় বাংলাদেশ আজ বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে ভৌগোলিক রাজনীতি বা জিওপলিটিক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং বাংলাদেশ এর কেন্দ্রবিন্দুতে আস্তে আস্তে জায়গা করে নিচ্ছে।

 

আমাদের দেশ ভারতের সঙ্গে ৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তের কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সব সময়ই বাংলাদেশের কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। আমরা জানি, ভারতের সঙ্গে অনেক সময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও কিছু ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দেয়। যেমন—তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য, কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি বিষয় বারবার আলোচনায় আসে।

ভারতের ওপর একতরফা নির্ভরতা বাংলাদেশকে কখনো কখনো চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। তাই বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে এমনভাবে কূটনীতি চালাতে হবে যাতে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। একইসঙ্গে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার মধ্য দিয়েও একটি কৌশলগত বিকল্প তৈরি করা যেতে পারে।

 

এখন আসা যাক বঙ্গোপসাগরের দিকে। বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য এক বিশাল সম্পদ ও সুযোগের উৎস। এখানে রয়েছে মাছ, খনিজ সম্পদ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা। চট্টগ্রাম, মোংলা এবং পায়রা বন্দরের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ভারতের পূর্বাঞ্চল, নেপাল, ভুটান, এমনকি চীনও এই বন্দরগুলোর মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে আগ্রহী।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যেমন—চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান—সবাই এখন বাংলাদেশের দিকে নজর দিচ্ছে। চীন চায় বাংলাদেশকে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অংশ হিসেবে রাখতে, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের কৌশলগত অংশীদার হোক। এই দুই বড় শক্তির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে খুব বুঝে-শুনে ভারসাম্য রেখে চলতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়।

 

আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা সম্পর্ক অনেকটা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই ইস্যুতে আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি।

এছাড়া আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে যেমন ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ (Connectivity), নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও বাণিজ্য এবং চীনের সঙ্গে অবকাঠামো সহযোগিতা—এইসব খাতে আরও পরিকল্পিত ও ব্যালেন্সড কূটনীতি প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগাতে পারে, তাহলে এটি কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি মাঝারি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত সেতুবন্ধনকারী দেশ (strategic bridge state) হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

 

কিন্তু সে জন্য চাই একটি দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় কৌশল—যেখানে দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশী সম্পর্ককে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হবে। বাংলাদেশ এখন যে অবস্থানে আছে, তা আমাদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি বিশাল সম্ভাবনাও বয়ে আনছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে অনেকের কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন দরকার সেই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশের স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া। এজন্য প্রয়োজন দূরদর্শী কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার চূড়ান্ত ব্যবহার।

0 Comments

সর্বাধিক পঠিত

শীর্ষ সপ্তাহ

আকরামুল হাসান
রাজনীতি

যেকোনো সময় অনুমোদন হতে পারে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি, আলোচনায় আকরামুল হাসান

ফাইয়াজ আল শরীফ> মে ১৩, ২০২৬ 0