বাগেরহাটে বোরো ধান কাটার মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাত কৃষকের উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে বুধবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে কাটা ধান ঘরে তুলতে বিড়ম্বনা পোহাচ্ছেন কৃষকরা। হঠাৎ বৃষ্টির কারণে পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক মাঠে ধান কাটতে পারছেন না, আবার অনেকের কাটা ধান ভিজে গিয়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
বাগেরহাট জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করা হয়েছে। বেশিরভাগ উপজেলার মাঠপর্যায়ে এখন ধান কাটার উৎসবে ব্যস্ত কৃষক। তবে বৃষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হলে পাকা ধান জমিতে নষ্ট হবার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন কৃষক।
জেলার মোল্লাহাট উপজেলার কৃষক হুমায়ূন রশিদ জানান, তিনি এবার দেড় বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ফলান বেশি। অর্ধেক জমির ধান কেটে ঘরে তুলেছেন, বাকি অর্ধেক জমির ধান সম্পূর্ণ না পাকার কারণে কাটতে পারছেন না। এর মাঝে বৃষ্টি তার ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফকিরহাটের ফলতিতা এলাকার কৃষক মো: আনিস শেখ জানান, গত দুইদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তাতে ধান কেটে ঘরে তোলার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও জমিতে পানি জমে কাটা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
বাগেরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোতাহার হোসেন জানান, জেলার ১৩ হাজার হেক্টর-এর মতো ধান কর্তন করা হয়েছে। কিছু কাটা ধান মাঠে রয়েছে। এর আনুমানিক ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কিছু ধান ঝরে পড়ে কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তবে বৃষ্টি না হলে কৃষকরা ক্ষতিপুষিয়ে নিতে পারবে বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
মোংলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে বৃষ্টির সাথে দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। মোংলা বন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। বুধবার দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ৬ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে ইরি-বোরো ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়েছে পুরোদমে। তবে আকাশে দুর্যোগের শঙ্কায় কৃষকরা দ্রুত ধান কাটতে মাঠে নেমে পড়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ধান কাটা-মাড়াইয়ের খরচও বেড়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এক বিঘা (৬০ শতক) জমির ধান কাটতে শ্রমিকদের ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এরপর মাড়াইয়ে আরও ১২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে মোট ব্যয় মেটাতে কৃষকদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কামারপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে আবাদ করলেও দুর্যোগের কারণে দ্রুত ধান কাটতে হচ্ছে। শ্রমিক সংকটের কারণে খরচ বেড়ে গেছে, এতে লাভ প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের কৃষকরা জানান, শ্রমিকের অভাবে অনেকে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করছেন। এতে খরচ তুলনামূলক কম হলেও কিছু এলাকায় মেশিন সংকটও রয়েছে। মৌসুমে অনেক রিকশা ও ভ্যানচালকও ধানকাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষন বলেন, প্রতি মৌসুমেই শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকারিভাবে হারভেস্টার মেশিন সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অন্য জেলা থেকেও মেশিন এনে ধান কাটার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেন।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের সাহানুর ইসলাম শিক্ষকতার পাশাপাশি মধু চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করছেন। জলঢাকার বগুলাগাড়ী হুসাইনিয়া (রাঃ) কওমিয়া মহিলা হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে স্বল্প বেতনে চার সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হওয়ায় প্রায় তিন বছর আগে তিনি মধু চাষ শুরু করেন। এখন এই পেশা থেকেই বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হয়েছে তার। সরিষা ক্ষেত, মিষ্টিকুমড়া ক্ষেত, লিচুবাগানসহ বিভিন্ন ফলবাগান ও ফসলের মাঠে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করেন সাহানুর। নিজ জেলা ছাড়াও ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি মধু সংগ্রহ করেন। পরে স্থানীয় বাজার ও অনলাইনে তা বিক্রি করেন। বর্তমানে তার কাছে ১৫টি মৌবাক্স রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি এপিস মেলিফেরা এবং ৫টি এপিস সেরেনা প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। এপিস সেরেনা জাতের মধুর কেজি বাজারে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা, আর এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মধু ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ উপজেলার একটি লিচুবাগানে বসানো ১০টি মৌবাক্স থেকে হারভেস্টিং মেশিনে প্রায় ৭ কেজি মধু সংগ্রহ করেন তিনি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭ হাজার টাকা। এটি লিচু ও মিষ্টিকুমড়া ফুলের সমন্বিত মধু। সাহানুর ইসলাম বলেন, “মধু চাষে খরচ খুব কম। মৌসুমে তেমন খরচ লাগে না। বর্ষাকালে মৌমাছিকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছুটা চিনি দিতে হয়। তবে মৌমাছির সংখ্যা বাড়লে মধু উৎপাদনও বাড়ে।” তিনি আরও জানান, মৌমাছি শুধু মধুই দেয় না, পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ও সবজির ফলনও বাড়ায়। তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বিভিন্ন ফসলের জমিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্থানীয় মিষ্টিকুমড়া চাষি সহিদুল ইসলাম জানান, “মৌচাষের কারণে জমিতে পরাগায়ন ভালো হয়। গত বছর ৪০ শতক জমি থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ করেছি। এবার লক্ষাধিক টাকা লাভের আশা করছি।” এ বিষয়ে আবু মো. মঞ্জুর রহমান বলেন, জেলায় বর্তমানে ২৭ জন মৌচাষি রয়েছেন। মৌচাষের ফলে বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষে ফলন বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে আরও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়বে এবং অর্গানিক মধু রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (BWMRI) নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে গম চাষে ইঁদুর দমন ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫–২৬ মৌসুমে বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্লক-৩ এলাকায় বারি গম-৩৩ জাতের প্রজনন বীজ ৪.৮০ হেক্টর, বারি গম-৩০ এবং বারি গম-৩২ যথাক্রমে ৫.৫ হেক্টর জমিতে বপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি খই ভুট্টা-১ (০.৭৫ হেক্টর) ও বারি মিষ্টি ভুট্টা-১ (০.৮০ হেক্টর) চাষ করা হচ্ছে। দেবীগঞ্জ বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের কর্মকর্তা ড. মোঃ ইলিয়াছ হোসেন জানান, “লাইন বা সারিভিত্তিক নালাভিত্তিক চাষাবাদ বীজের অপচয় কমায়, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনায় সুবিধা দেয় এবং ফলন বৃদ্ধি করে। সঠিক জাত ও সময়ে বপন করলে কৃষকরা বেশি ফলন পাবেন। বারি গম-৩৩ জাতে প্রতি কেজিতে ৫০–৫৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক ব্যবহার করা হয়, যা পুষ্টি বৃদ্ধিতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক।” BWMRI-এর নতুন উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি বিএডিসি (BADC) মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ দেশের গম উৎপাদনে মানসম্মত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।