সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে এখন সরিষার হলুদে ভরে উঠেছে মাঠ। দোল খাওয়া সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জনে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। চলতি মৌসুমে জেলায় ১৯ হাজার ১৬২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে ২৭ হাজার ২০২ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।
সরিষার পাশাপাশি মধু আহরণেও সাফল্য এসেছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৮ টন মধু উৎপাদনের, তবে ইতোমধ্যে প্রায় ৬১ টন মধু সংগ্রহ করা হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মৌসুম শেষে এই উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় টরি-৭, বারি-৯, ১৪, ১৭, ১৮, ২০ এবং বিনা-৯ ও ১১ জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। এসব ক্ষেতে মৌচাষিরা মৌবাক্স স্থাপন করে মৌমাছি পালন করছেন। মৌচাষ থেকে মোট ৭৫ হাজার কেজি মধু উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপজেলা ভিত্তিক হিসাবে সদর উপজেলায় ৫ হাজার ২৫৫ হেক্টরে, তালায় ১ হাজার ৩৬৫, কলারোয়ায় ৭ হাজার ৬৫৫, দেবহাটায় ১ হাজার ৯০৫, কালিগঞ্জে ১ হাজার ২৪০, আশাশুনিতে ৯৮০ এবং শ্যামনগরে ৭৬২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় ১৬ হাজার কৃষককে প্রণোদনার আওতায় সরিষার বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫৮ টন থাকলেও ইতোমধ্যে তা অতিক্রম করেছে। এটি জেলার জন্য একটি বড় সাফল্য।”
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের সাহানুর ইসলাম শিক্ষকতার পাশাপাশি মধু চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করছেন। জলঢাকার বগুলাগাড়ী হুসাইনিয়া (রাঃ) কওমিয়া মহিলা হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে স্বল্প বেতনে চার সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হওয়ায় প্রায় তিন বছর আগে তিনি মধু চাষ শুরু করেন। এখন এই পেশা থেকেই বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হয়েছে তার। সরিষা ক্ষেত, মিষ্টিকুমড়া ক্ষেত, লিচুবাগানসহ বিভিন্ন ফলবাগান ও ফসলের মাঠে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করেন সাহানুর। নিজ জেলা ছাড়াও ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি মধু সংগ্রহ করেন। পরে স্থানীয় বাজার ও অনলাইনে তা বিক্রি করেন। বর্তমানে তার কাছে ১৫টি মৌবাক্স রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি এপিস মেলিফেরা এবং ৫টি এপিস সেরেনা প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। এপিস সেরেনা জাতের মধুর কেজি বাজারে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা, আর এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মধু ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ উপজেলার একটি লিচুবাগানে বসানো ১০টি মৌবাক্স থেকে হারভেস্টিং মেশিনে প্রায় ৭ কেজি মধু সংগ্রহ করেন তিনি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭ হাজার টাকা। এটি লিচু ও মিষ্টিকুমড়া ফুলের সমন্বিত মধু। সাহানুর ইসলাম বলেন, “মধু চাষে খরচ খুব কম। মৌসুমে তেমন খরচ লাগে না। বর্ষাকালে মৌমাছিকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছুটা চিনি দিতে হয়। তবে মৌমাছির সংখ্যা বাড়লে মধু উৎপাদনও বাড়ে।” তিনি আরও জানান, মৌমাছি শুধু মধুই দেয় না, পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ও সবজির ফলনও বাড়ায়। তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বিভিন্ন ফসলের জমিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্থানীয় মিষ্টিকুমড়া চাষি সহিদুল ইসলাম জানান, “মৌচাষের কারণে জমিতে পরাগায়ন ভালো হয়। গত বছর ৪০ শতক জমি থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ করেছি। এবার লক্ষাধিক টাকা লাভের আশা করছি।” এ বিষয়ে আবু মো. মঞ্জুর রহমান বলেন, জেলায় বর্তমানে ২৭ জন মৌচাষি রয়েছেন। মৌচাষের ফলে বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষে ফলন বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে আরও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়বে এবং অর্গানিক মধু রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (BWMRI) নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে গম চাষে ইঁদুর দমন ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫–২৬ মৌসুমে বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্লক-৩ এলাকায় বারি গম-৩৩ জাতের প্রজনন বীজ ৪.৮০ হেক্টর, বারি গম-৩০ এবং বারি গম-৩২ যথাক্রমে ৫.৫ হেক্টর জমিতে বপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি খই ভুট্টা-১ (০.৭৫ হেক্টর) ও বারি মিষ্টি ভুট্টা-১ (০.৮০ হেক্টর) চাষ করা হচ্ছে। দেবীগঞ্জ বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের কর্মকর্তা ড. মোঃ ইলিয়াছ হোসেন জানান, “লাইন বা সারিভিত্তিক নালাভিত্তিক চাষাবাদ বীজের অপচয় কমায়, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনায় সুবিধা দেয় এবং ফলন বৃদ্ধি করে। সঠিক জাত ও সময়ে বপন করলে কৃষকরা বেশি ফলন পাবেন। বারি গম-৩৩ জাতে প্রতি কেজিতে ৫০–৫৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক ব্যবহার করা হয়, যা পুষ্টি বৃদ্ধিতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক।” BWMRI-এর নতুন উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি বিএডিসি (BADC) মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ দেশের গম উৎপাদনে মানসম্মত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বলইবুনিয়া ইউনিয়নের দোনা গ্রামের কৃষক আজিজুল হাকীম শীতপ্রবাহ উপেক্ষা করে নিজের এক একর জমিতে কুইক স্টার বিটকপি চাষ করে বাম্পার ফলন তুলে নিয়েছেন। দীর্ঘ ৩০ বছরের কৃষিজীবনে এটি তার অন্যতম সফল চাষ বলে জানাচ্ছেন তিনি। চাষি আজিজুল হাকীম জানান, তার ক্ষেতে কুইক স্টার এবং জিরো-৫ প্রজাতির বিটকপি চারা রোপণ করা হয়েছে। ৮৫ দিনের চাষে তিনি প্রায় ৫০০ মন বিটকপি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। চারা রোপণ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে তার মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। তবে ফলন অনুযায়ী তিনি আশা করছেন প্রায় ৫ লাখ টাকার লাভ করতে পারবেন। এ ফসল থেকে তিনি নিজের পরিবারে বৃদ্ধ মাতা, স্ত্রী ও ছয় সন্তানসহ সংসারের সব ব্যয় মিটিয়ে কিছু সঞ্চয়ও করতে পারবেন। আজিজুল হাকীম বলেন, “পৈত্রিক জমিতে কুইক স্টার চাষ করে এত ভালো ফলন পেয়েছি, এটি আমার জন্য এক অনন্য আনন্দ। পরিশ্রমের মূল্য এই ফলন দেখিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কৃষক শীতকালীন রবি শস্য ও সবজি চাষে আগ্রহী হবেন।” উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এস এম আলী আশরাফ জানান, “আজিজুল হাকীমের সফলতা পুরো ইউনিয়নের জন্য দৃষ্টান্ত। কৃষি দপ্তর নতুন নতুন ফসল উৎপাদন ও আধুনিক চাষপ্রণালীর প্রশিক্ষণ দিয়ে এমন চাষিদের উৎসাহিত করছে। শীতকালীন সবজি চাষে এ ধরনের সফলতা স্থানীয় কৃষকদের জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” সরেজমিন দেখা যায়, আজিজুল হাকীমের একর জমিতে সবুজ কুইক স্টার বিটকপি ঘনবিপুলভাবে ছড়িয়ে আছে। মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের চোখে স্বচ্ছ আনন্দ ও চাষির মুখে সন্তুষ্টির হাসি প্রকৃত অর্থেই তার সফলতার প্রমাণ বহন করছে।