ঢাকা, ২৫ জুন ২০২৫ – জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গু জ্বর, চিকুনগুনিয়া ও জলবাহিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক আবহাওয়া ও তাপমাত্রার তারতম্য এডিস মশার বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বৃষ্টি হলেও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় শহরাঞ্চলে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সায়েম বলেন, “গ্রীষ্মকাল এখন দীর্ঘতর ও অনিয়মিত হয়েছে, যা মশাবাহিত রোগ ছড়ানোর সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে ডেঙ্গু মৌসুম সীমিত ছিল জুন থেকে সেপ্টেম্বর, এখন তা প্রায় সারা বছরই দেখা যায়।”
এছাড়া, চট্টগ্রাম ও বরিশাল অঞ্চলে বর্ষার শুরুতেই টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে পানিবাহিত জীবাণু সহজেই খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কৃষিক্ষেত্রের সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। শহরের অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঢাকাসহ বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে মশা নিধনের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি মৌসুমভিত্তিক অভিযান না হয়ে স্থায়ী পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে ইরি-বোরো ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়েছে পুরোদমে। তবে আকাশে দুর্যোগের শঙ্কায় কৃষকরা দ্রুত ধান কাটতে মাঠে নেমে পড়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ধান কাটা-মাড়াইয়ের খরচও বেড়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এক বিঘা (৬০ শতক) জমির ধান কাটতে শ্রমিকদের ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এরপর মাড়াইয়ে আরও ১২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে মোট ব্যয় মেটাতে কৃষকদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কামারপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে আবাদ করলেও দুর্যোগের কারণে দ্রুত ধান কাটতে হচ্ছে। শ্রমিক সংকটের কারণে খরচ বেড়ে গেছে, এতে লাভ প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের কৃষকরা জানান, শ্রমিকের অভাবে অনেকে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করছেন। এতে খরচ তুলনামূলক কম হলেও কিছু এলাকায় মেশিন সংকটও রয়েছে। মৌসুমে অনেক রিকশা ও ভ্যানচালকও ধানকাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষন বলেন, প্রতি মৌসুমেই শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকারিভাবে হারভেস্টার মেশিন সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অন্য জেলা থেকেও মেশিন এনে ধান কাটার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেন।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের সাহানুর ইসলাম শিক্ষকতার পাশাপাশি মধু চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করছেন। জলঢাকার বগুলাগাড়ী হুসাইনিয়া (রাঃ) কওমিয়া মহিলা হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে স্বল্প বেতনে চার সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হওয়ায় প্রায় তিন বছর আগে তিনি মধু চাষ শুরু করেন। এখন এই পেশা থেকেই বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হয়েছে তার। সরিষা ক্ষেত, মিষ্টিকুমড়া ক্ষেত, লিচুবাগানসহ বিভিন্ন ফলবাগান ও ফসলের মাঠে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করেন সাহানুর। নিজ জেলা ছাড়াও ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি মধু সংগ্রহ করেন। পরে স্থানীয় বাজার ও অনলাইনে তা বিক্রি করেন। বর্তমানে তার কাছে ১৫টি মৌবাক্স রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি এপিস মেলিফেরা এবং ৫টি এপিস সেরেনা প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। এপিস সেরেনা জাতের মধুর কেজি বাজারে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা, আর এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মধু ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ উপজেলার একটি লিচুবাগানে বসানো ১০টি মৌবাক্স থেকে হারভেস্টিং মেশিনে প্রায় ৭ কেজি মধু সংগ্রহ করেন তিনি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭ হাজার টাকা। এটি লিচু ও মিষ্টিকুমড়া ফুলের সমন্বিত মধু। সাহানুর ইসলাম বলেন, “মধু চাষে খরচ খুব কম। মৌসুমে তেমন খরচ লাগে না। বর্ষাকালে মৌমাছিকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছুটা চিনি দিতে হয়। তবে মৌমাছির সংখ্যা বাড়লে মধু উৎপাদনও বাড়ে।” তিনি আরও জানান, মৌমাছি শুধু মধুই দেয় না, পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ও সবজির ফলনও বাড়ায়। তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বিভিন্ন ফসলের জমিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্থানীয় মিষ্টিকুমড়া চাষি সহিদুল ইসলাম জানান, “মৌচাষের কারণে জমিতে পরাগায়ন ভালো হয়। গত বছর ৪০ শতক জমি থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ করেছি। এবার লক্ষাধিক টাকা লাভের আশা করছি।” এ বিষয়ে আবু মো. মঞ্জুর রহমান বলেন, জেলায় বর্তমানে ২৭ জন মৌচাষি রয়েছেন। মৌচাষের ফলে বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষে ফলন বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে আরও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়বে এবং অর্গানিক মধু রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (BWMRI) নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে গম চাষে ইঁদুর দমন ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫–২৬ মৌসুমে বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্লক-৩ এলাকায় বারি গম-৩৩ জাতের প্রজনন বীজ ৪.৮০ হেক্টর, বারি গম-৩০ এবং বারি গম-৩২ যথাক্রমে ৫.৫ হেক্টর জমিতে বপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি খই ভুট্টা-১ (০.৭৫ হেক্টর) ও বারি মিষ্টি ভুট্টা-১ (০.৮০ হেক্টর) চাষ করা হচ্ছে। দেবীগঞ্জ বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের কর্মকর্তা ড. মোঃ ইলিয়াছ হোসেন জানান, “লাইন বা সারিভিত্তিক নালাভিত্তিক চাষাবাদ বীজের অপচয় কমায়, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনায় সুবিধা দেয় এবং ফলন বৃদ্ধি করে। সঠিক জাত ও সময়ে বপন করলে কৃষকরা বেশি ফলন পাবেন। বারি গম-৩৩ জাতে প্রতি কেজিতে ৫০–৫৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক ব্যবহার করা হয়, যা পুষ্টি বৃদ্ধিতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক।” BWMRI-এর নতুন উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি বিএডিসি (BADC) মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ দেশের গম উৎপাদনে মানসম্মত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।